আরো দু’টি খুন: নাজিব ওয়াদুদ
(নাজিব ওয়াদুদ বর্তমান সময়ের শক্তিমান কথাশিল্পী গল্প, উপন্যাস, অনুবাদসহ সাহিত্যের সকল ক্ষেত্রেই তার অবাধ বিচরণ। প্রকাশিত হল তার “আরো দু’টি খুন” গল্পটির ২ য় অংশ)
-কী ব্যাপার? হঠাৎ?
-কেন, আপনি খুশি হননি?
-না, না, কথা সেটা নয়। অনেক দিন পরে… হঠাৎ না বলে না কয়ে… আমি তো না-ও থাকতে পারতাম?
-আসলে আপনাকে আমি সারপ্রাইজ দিতে চেয়েছিলাম। আপনি সারপ্রাইজ্ড হননি?
-হ্যাঁ, তা হয়েছি। তবে আজকে আমি ঝামেলার মধ্যে আছি, বুঝছো?
হতাশ হলো শিরিন, বললো, আমাকে চলে যেতে বলছেন?
-না, না, তা বলবো কেন? ওপরে চলো।
প্রফেসরের এড়িয়ে যাওয়ার ভাব বুঝতে কষ্ট হলো না শিরিনের, তবু তা গায়ে মাখলো না সে, হয়তো সত্যিই কোনো ঝামেলার মধ্যে আছেন তিনি, মন ভালো নেই তার। তবে তাকে চেনে সে, আদরের কাঙ্গাল লোকটা, কতোণ আর তাকে এড়িয়ে থাকতে পারবে? তার সব ঝামেলা-দুশ্চিন্তা মুছে দেবে সে।
প্রফেসর তার সরাসরি শিক। তবে ছাত্রজীবনে তেমন জানাশোনা ছিলো না। লেখাপড়া শেষ করে একটা কলেজে ঢুকে পড়ার পর বছর দু’য়েক দেখা-সাাতই ছিলো না। এমফিল করতে এসে তাকে নিতে হলো সুপারভাইজার হিসেবে, মূলতঃ তারপর থেকেই তার সঙ্গে শিরিনের ঘনিষ্ঠতা। অসম বয়সী এ দুই শিক-ছাত্রীর মধ্যেকার সম্পর্কটা ক্রমেই সকল ফারাক মুছে ফেলতে থাকে এবং একদিন এক দুর্বল মুহূর্তে, যে দূরত্বটুকু তখনো পর্যন্তও অবশিষ্ট ছিলো, তা-ও ঘুচে গেল। তারপর থেকে আর কোনো বাধাই রইলো না। এমফিল থেকে পিএইচডিতে রূপান্তর, এবং সে পিএইচডির কাজও শেষ হলো। শিরিন এখন তার নামের আগে ডক্টর লেখে। প্রফেসর কথা দিয়েছিলেন শিরিনকে তিনি তার ডিপার্টমেন্টেই শিক হিসেবে ঢুকিয়ে নেবেন। তারপর তারা বিয়ে করবেন। কিন্তু ডিপার্টমেন্টের রাজনীতি সব হিসাব-নিকাশ পাল্টে দিলো, নিজের লোকেরাই ঝামেলা বাধাচ্ছে। তবু তিনি আশা ছাড়েননি, শিরিনও বসে আছে তার ভরসায়। সে তার কলেজে ফিরে গেছে, কিন্তু যখনই সময় পায় ছুটে আসে এখানে, মাসে-দু’মাসে অন্তত একবার, থাকে দু’তিন দিন। এবার আসতে বেশ দেরিই হয়েছে।
-আপনাকে আমি ভীষণ মিস করি স্যার!
-আমিও। বাট ইয়্যু আর এ নটি গার্ল, আমাকে একা ফেলে রেখে কষ্ট দিচ্ছ।
কথাটায় আগের মতো আবেগ নেই যেন, কেমন কৃত্রিম মনে হয়, তবু আদরে গলে যাওয়ার ভাব করে শিরিন। চোখ মটকে বলে, আমি? আপনাদের সপ্তাহে একটা-দু’টো কাস, তা-ও না নিলে কেউ বলার নেই, কিন্তু আমাদেরকে প্রত্যেক দিন কলেজে যেতেই হয়। আজকাল ছুটি পাওয়া খুবই কঠিন হয়ে গেছে। প্রিন্সিপ্যাল লোকটা তো একটা নীতিবাগিশ। তা আমার কি কিছু হবে স্যার? আর কতো দিন বসে থাকবো?
-আর কিছু দিন। ভিসি-প্রোভিসি আমার হাতের মুঠোয় এসে যাচ্ছে, ডিপার্টমেন্টকেও প্রায় বাগে এনে ফেলেছি। সুদিন আর বেশি দূরে নয় ডার্লিং, হতে পারে কিছুদিন পরে তোমার এই ইয়াং লাভারটাই ভিসি হয়ে যাবে। কিংবা ভিসি না হলেও আমাকে মাইনাস করে কোনো কাজ করার মতা কারো থাকবে না, সে পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। জানো তো, সবুরে মেওয়া ফলে।
-তাহলে আমরা বিয়েটা সেরে নিই?
-তা নেওয়া যায়, অন্য কোনো বাধা নেই। তবে তখন তোমাকে ডিপার্টমেন্টে নেওয়া আমার পে একেবারে অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে, আমরা তখন সকলের চোখের বিষ হয়ে যাবো। স্বজনপ্রীতির অভিযোগ উঠবে। সেটা ঠিক হবে না। আর তো ক’টা মাস, সবুর করো।
খেয়ে উঠে বিছানায় গেল ওরা। খানিকণ গান শুনলো, খানিকণ বারান্দার আলো-আঁধারিতে পায়চারি করলো, বসেও থাকলো খানিকণ। বাড়িটা গাছগাছালিতে ঘেরা, বেশ গ্রাম-গ্রাম গন্ধ পরিবেশের মধ্যে, কিন্তু আবহাওয়ায় কিছু গুমোট ভাব, মাঝে-মধ্যে মৃদু বাতাস বয়ে যায় শরীরে হালকা শীতল পরশ বুলিয়ে। ওরা ঘনিষ্ঠ হয়ে পরস্পরকে অনুভব করে।
-কিন্তু আমাদের বিয়েটা হয়ে যাওয়া দরকার। লোকজন সবাই আস্তে আস্তে জেনে যাচ্ছে। বিব্রতকর পরিস্থিতির মধ্যে পড়ে যাচ্ছি আমি।
-জানতে দাও তোমার সো-কল্ড লোকদেরকে। জেনে কী করবে? একটা অশ্লীল খিস্তি করলেন প্রফেসর। এ রকম কথার সঙ্গে পরিচিত শিরিন, তার মধ্যে একথা কোনো প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে না। বলে, কিন্তু বাপ-মাকে কী বলে বুঝাই?
-বোঝাও, আর বেশিদিনের ব্যাপার নয়।
-আমার এক বান্ধবী আমাদের ব্যাপারটাকে এরশাদ-বিদিশা বলে ক্ষ্যাপায়।
-তা খারাপ বলে না। তোমার রাগ হয় নাকি? হালকা রসিকতা করেন প্রফেসর।
-কখনো কখনো খুব খারাপ লাগে। এভাবে তো জীবন চলে না। তাছাড়া নতুন একটা সমস্যা …
টেলিফোন বেজে উঠলো। একবার রিং বাজতেই পড়ি-মরি করে উঠে গিয়ে টেলিফোন ধরলেন প্রফেসর, যেন এতণ টেলিফোনের অপোতেই ছিলেন। কিন্তু হতাশ হলেন, বিরক্তি ফুটে উঠলো তার মুখে-চোখে, বললেন, বলেছি তো, এসব ব্যাপারে আমি নাক গলাতে চাই না, করার মতো আমার অনেক কাজ আছে। আপনাদের গ্রুপকে বলেন। না হয় সরাসরি ভিসির সঙ্গে কথা বলেন। আচ্ছা রাখি। রেখে দিলেন টেলিফোন।
-চাকরির তদবির?
-আর বোলো না। যেন সব কাজের টেণ্ডার নিয়েছি আমি।
-আপনি যে নেতা। নেতার কাছে সবারই কিছু প্রত্যাশা থাকে।
-আরে না, সব অপরচুনিস্ট। তদবিরের বেলায় আছে, অথচ আমার যখন প্রয়োজন তখন নানান অজুহাত। যত্ত সব রাবিশ!
শিরিন বললো, তাতে কী হয়েছে? নেতার কাছে আপন-পর বলে ভেদাভেদ থাকা কাম্য নয়। পারলে সবার কাজই করা উচিৎ।
এবার মোবাইল বেজে উঠলো। সেটি হাতের কাছেই ছিলো, তুলে নাম্বার দেখে নিলেন প্রফেসর, তারপর বাটন টিপে বললেন, হ্যাঁ, দাঁড়াও, কথা বলতে বলতে উঠে বাইরে বারান্দায় গেলেন। শিরিনের মনে হলো তিনি কথা বলতে চান একান্তে, সাক্ষী রাখতে চান না কাউকে। পরের কথা শোনার তেমন আগ্রহ নেই তার, সে মানসিকতাও এখন নেই, তার মাথার মধ্যে ঘুরছে সে একটাই কথা- যে কথা বলার জন্যে এখানে এবার আসা তার। খুব জরুরি কথা, কিন্তু যখন তখন বলা যাবে না সে কথা, কারণ সে কথা শুনে কী প্রতিক্রিয়া হবে প্রফেসরের কে জানে! অথচ তার কাছ থেকে পজিটিভ রেসপন্স বের করতে চায় শিরিন। সেটা সম্ভব, এ বিশ্বাস তার ষোল আনা, তাকে জানে সে, বাইরে থেকে যত কঠিন আর ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মনে হয় ততটা নয় সে। হয়তো সব মানুষই তাই, হয়তো সব মানুষেরই এমন সব গোপন পরিবেশ-পরিস্থিতি থাকে যখন সে হয়ে ওঠে নিদারুণ মূর্খ, দিকভোলা, ব্যক্তিত্বহীন, দুর্বল। প্রফেসরের সে দুর্বলতা কোথায় তা তার জানা আছে। সুতরাং সে আস্থাবান, সে পারবে, তার জন্যে শুধু একটু পরিবেশ দরকার, প্রেমঘন আবেগময় একটা পরিবেশ, সেটুকু তাকে তৈরি করে নিতে হবে। সেটাও এমন কোনো কঠিন কাজ নয়। এসব ভাবতে ভাবতে মনটা বেশ ফুরফুরে হয়ে উঠলো, বিছানায় গা এলিয়ে দিলো সে।
দেয়ালঘড়িতে রাত একটা বাজার ঢং শব্দ হলো। বারান্দা থেকে ফিরে এলেন প্রফেসর। শিরিন বললো, ভালো ভিডিও নেই?
-থাকবে না কেন? বাংলা, হিন্দী, না ইংরেজী? কী চাও?
থাকবে তা জানে শিরিন। ভিডিও দেখা প্রফেসরের নেশা, নানা রকম ছবির ক্যাসেট স্টকে রাখেন সব সময়। সে বললো, ইংরেজী?
-নিচের ড্রয়ারে আছে দ্যাখো।
-কোনটা ভালো হবে?
প্রফেসর বললেন, সব ক’টাই ভালো। বেশ রগরগে ছবি আছে দ্যাখো।
-ব্লুফিল্ম নাকি?
-না, ঠিক তা নয়। তবে এ রকমই আমার ভালো লাগে, ইউ নো ইট।
-ইয়েস মাই ডার্লিং! আই ডু নো!
ছবি শুরু হলো। সূচনাতেই বারের দৃশ্য। প্রফেসর বললেন, এই যে মেয়েটাকে দেখছো, বেকার, পিতা বা মাতার সূত্রে প্রাপ্ত কোনো সম্পদও নেই তার, কী চমৎকার ফিগার, ভরা যৌবন, পুরুষকে আকর্ষণ করার মতা, এসবই তার জীবিকার হাতিয়ার।
-বেশ্যা?
-না, না, তাকে বেশ্যা বলতে পারো না। সে ভালোবাসতে চায়, ঘর বাঁধতে চায়, কিন্তু একে একে সবাই দেখবে তার সঙ্গে প্রতারণা করছে, তাকে ভোগ করাই আসল উদ্দেশ্য, আসলে ওদের সমাজ, সংস্কৃতি, জীবনাদর্শই এ রকম, খাও-দাও, ফূর্তি করো, আর কিছু না…
-তাহলে নারীকে ওরা পণ্য বানিয়েছে বলেন, নারী-স্বাধীনতার নামে, প্রগতিশীলতার নামে …
-না, না, ঠিক তা নয়, জীবন বড়ো কঠিন, বুঝছো? … মানে …
আবার মোবাইল বাজলো। ফোন ধরেই বললেন, সব ঠিক আছে তো? সেকি কথা? প্রায় ছুটে বারান্দায় গেলেন প্রফেসর। বললেন, না, না, এখানে নয়, তোমরা শহরের দিকে চলে যাও।
শিরিন টিভির আওয়াজ কমিয়ে দিলো। দূরে, পুব দিকে, হৈ চৈ, মনে হচ্ছে মিছিল, বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে এরকম হট্টগোল প্রায় নৈমিত্তিক ব্যাপার, গায়ে মাখলো না সে। তার কানে প্রফেসরের কথা ভেসে আসছে, বারবার একই কথা বলে চলেছেন, না, না, এখানে নয়, তোমরা অন্য কোথাও যাও, একেবারে ক্যাম্পাসের বাইরে, শহরে চলে যাও। সব কিছু তো ঠিক করাই আছে! কথা শেষ করে যখন ঘরে ঢুকলেন প্রফেসর, তখন তাকে বেশ বিধ্বস্ত ও উদ্বিগ্ন দেখালো। কয়েক জায়গায় ফোন করলেন তিনি, বললেন, কিছু একটা গোলমাল হয়েছে, সম্ভবতঃ আমির আলী হলে, খোঁজ-খবর নেয়া দরকার, তবে এখনি পুলিশ ডাকার দরকার নেই। না, না, পুলিশ যেন না আসে, আই রিপিট ইট- কোনো ক্রমেই পুলিশ যেন না আসে। হয়তো ওপাশ থেকে চাপ আসছিলো, তিনি পাত্তা দিলেন না, বললেন, আমি এখন যেতে পারছি না, সারাদিন বাইরে ছিলাম, একটু আগে ফিরেছি, খুব কান্ত। এ রকম বাহানা দেখিয়ে ঝামেলা এড়াতে প্রফেসরকে এর আগেও দেখেছে শিরিন, তার সঙ্গে সময় কাটানোর স্বার্থে। ব্যাপারটা ভালো লাগলো তার, সে চাচ্ছে না এখন কোনো ঝামেলায় জড়িয়ে পড়–ক প্রফেসর। আজ রাতেই সে কথা সেরে নিতে চায়। রাত ক্রমেই গভীর হচ্ছে।
এরপর একের পর এক টেলিফোন আসতে লাগলো, সবাইকেই তিনি প্রায় একই কথা শোনালেন। প্রফেসর ভিসি-প্রোভিসি কেউ নন, কিন্তু তাদেরকে সহযোগিতা করতে হয় তাকে, বিশ্ববিদ্যালয়ে তার একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে। শিরিন বললো, ক্যাম্পাসে গোলমাল হয়েছে বুঝতে পারছি। খুব খারাপ অবস্থা নাকি?
-না, তেমন কিছু না। গুরুত্ব দিলেন না প্রফেসর, এ নিয়ে আলোচনা করতেও অনাগ্রহী তিনি তা তার বিরক্তি ভাব থেকে বোঝা যায়। শিরিন আর কথা বাড়ালো না। সে টিভির আওয়াজ আবার বাড়িয়ে দিলো, রোমান্টিক পরিবেশটা আবার ফিরিয়ে আনতে চায় সে। তার মনের মধ্যে যে কথাটা বুদ্বুদ করছে বেরিয়ে আসার জন্যে, সে কথাটা বলার জন্যেই এবার তার আসা, এবং এ কথা বলতেই হবে তাকে, অথচ বেশি সময় নেই হাতে। কিন্তু তার জন্যে যে পরিবেশ দরকার, প্রয়োজন যে একটা আবেগঘন দুর্বল মুহূর্তের, সেটা পাওয়া যাচ্ছে না। শুরু থেকেই আবহাওয়া বিরূপ, মন ভালো নেই প্রফেসরের তা সে বুঝতে পেরেছে, তাই সময় তৈরি করতে চাইছে শিরিন। -রাখেন তো ওসব ঝামেলা! এতো দিন পরে এলাম, কোথায় একটু প্রেম-ট্রেম করবো, তা না… তাকে এক রকম জোর করে বিছানায় নিয়ে এলো সে, জড়িয়ে ধরে চুমু খেলো, বুকের মধ্যে চেপে ধরলো তার মুখ।
আবার টেলিফোন বেজে উঠলো। প্রফেসরকে ছাড়তে চাচ্ছিলো না শিরিন, কিন্তু ছাড়তে হলো, কারণ তিনি অনুনয়-বিনয় করতে লাগলেন, ধমকও দিলেন। রাগে-বিরক্তিতে শিরিন বিছানায় পড়ে থাকলো। টেলিফোনের রিসিভার কানে ধরতেই উদ্বেগ ফুটে উঠলো তার চোখে-মুখে। -কেন? পুলিশ ঢুকলো কী করে? আমি প্রক্টরকে বললাম, ভিসিকে বললাম, ধরো ওদেরকে। রু হয়ে উঠলো তার মেজাজ। -না,



























