অন্তঃসারশূন্য ১/১১’র সরকার : আতাউস সামাদ
১১ জানুয়ারি, ২০০৭-এর তখনকার সেনাপ্রধান জেনারেল মইন উ আহমেদ ও তাঁর কয়েক মিলিটারি সঙ্গী সে সময়ের রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদকে দেশে জরুরি অবস্থা জারি করতে ও তাঁকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার পদ ছেড়ে দিতে বাধ্য করেন। রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন প্রধান উপদেষ্টার পদটি প্রায় ছিনতাই করে দখল করেছিলেন বলে দেশের রাজনৈতিক মহল তাঁকে সন্দেহের চোখে দেখত। কেবল বিএনপির বিতর্কিত রাজনৈতিক নেতারাই তাঁকে কোমর বেঁধে সমর্থন করতেন। তাতে লাভ হয়নি, কারণ ইয়াজউদ্দিন একাদিক্রমে উল্টাপাল্টা কাজ করে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাজকর্মের নির্দলীয় চরিত্রটি একদম নষ্ট করে ফেলায় এবং ত্যক্ত-বিরক্ত কয়েকজন উপদেষ্টা পদত্যাগ করায় দেশের জনগণ রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ ও তাঁর পরিচালনাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রতি সম্মান হারিয়ে ফেলেন। ওই সরকার হয়ে যায় খোঁড়া ও দুর্বল। সুষ্ঠু নির্বাচনের নিশ্চয়তার দাবি তুলে আওয়ামী লীগ ও তার মহাজোট সঙ্গীদের পক্ষে লাগাতার আন্দোলন চালিয়ে ওই তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে কোণঠাসা করে ফেলতে কোনো অসুবিধা হয়নি। অন্যদিকে পাঁচ বছর ধরে চারদলীয় জোট সরকার অযোগ্যতা, স্বজনপ্রীতি, পক্ষপাতিত্ব এবং ভীতিকর গ্রেনেড হামলাকারীদের ধরা তো দূরের কথা, এমনকি প্রতিরোধ করতে ব্যর্থতার দরুন জনগণের বিশাল অংশ এর প্রতি বিমুখ হয়ে পড়েছিল। স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী জামায়াতে ইসলামীকে সরকারে অংশীদার করায়ও অনেকেই বিএনপির ওপর খুবই বিরক্ত ছিলেন। ফলে বিএনপি তাদের লোক অধ্যাপক ইয়াজউদ্দিনের তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে কোনো কার্যকর শক্তি জোগাতে পারেনি। এ অবস্থায় জেনারেল মইনদের পক্ষে রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিনকে তাঁদের বশংবদে পরিণত করতে ২০০১-এর ১১ জানুয়ারি মাত্র ঘণ্টাখানেক সময় লেগেছিল। এরপর দৃশ্যপটে আগমন ঘটে সাবেক সিএসপি, আমলা ও বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে জোট সরকারের অর্থমন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার হাতে আমদানি হওয়া ড. ফখরুদ্দীন আহমদের। তিনি এলেন জেনারেল মইন উ আহমেদের দ্বারা মনোনীত হয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা পদে।
এভাবে শুরু হলো ১/১১ নাটকের প্রথম অঙ্ক। এ অঙ্কেই ডংকা বাজিয়ে মইন-ফখরুদ্দীনরা আরম্ভ করলেন তাঁদের ভাষায় দুর্নীতিবিরোধী অভিযান। তাঁদের কাছে এ অভিযান এতই মূল্যবান ও জরুরি ছিল যে সপ্তম জাতীয় সংসদ ভেঙে যাওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে পরবর্তী জাতীয় সংসদের জন্য যে সাধারণ নির্বাচন হওয়ার কথা ছিল, তা অনির্দিষ্টকালের জন্য পিছিয়ে গেল। সংবিধান সংরক্ষণের জন্য সুপ্রিম কোর্টের সাম্প্রতিক বিভিন্ন রায় নিয়ে যাঁরা আজকে তুমুল আনন্দ করছেন তাঁরা ১/১১-এর মাধ্যমে সংবিধানের যে মারাত্মক অবমাননা চলল, পরবর্তী দুই বছর ধরে তার তেমন কোনো প্রতিবাদ করেননি। বরঞ্চ তাঁদের কেউ কেউ কথিত সুশীল সমাজের একটি অংশ এবং দু-একটি সংবাদপত্র ওই ঘৃণ্য কাজে সমর্থন জুগিয়েছে। আর মুষ্টিমেয় যে কয়জন নাগরিক (অল্প কয়েকজন সাংবাদিক, কলামিস্ট ও অন্তত দুজন সাবেক আমলাসহ) সেই সময় সংবিধানের সম্মান ও দ্রুত জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠান করে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার তাগিদ দিয়েছেন, তাঁদের গঞ্জনা ও ভয়-ভীতি সহ্য করতে হয়েছিল। তবে তাঁরা যা করেছিলেন তা দেশ ও জনগণের স্বার্থে করেছিলেন_এই ভেবে নীরবে কিছুটা তৃপ্তি অনুভব করতে পারেন এবং মহান আল্লাহ তাঁদের যে এটুকু ভালো কাজ করার সাহস ও শক্তি জুগিয়েছিলেন সে জন্য তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে পারেন। আমার খুবই সৌভাগ্য যে আমি এই ছোট্ট দলটির সহযাত্রী হতে পেরেছিলাম।
আমার স্পষ্ট মনে আছে, দেশের সেই দুঃসময়ে আমরা যে কটি কথা বারবার বলতাম তার মধ্যে খুবই উল্লেখযোগ্য ছিল : (১) জরুরি অবস্থা ও দুর্নীতি দমনের নামে মানবাধিকার ও দেশের প্রচলিত আইন লঙ্ঘন করা চলবে না; (২) জাতীয় সংসদের নির্বাচন স্থগিত রেখে জনপ্রতিনিধি নন, দেশে এমন ব্যক্তিদের দিয়ে সরকার চালানোতে প্রশাসন ও অর্থনীতির অপূরণীয় ক্ষতি হচ্ছে; (৩) সৎ ও যোগ্য প্রার্থীদের জন্য পথ পরিষ্কার করার প্রয়োজনে নির্বিচার দুর্নীতি দমন অভিযান চালানো ও ক্যাঙ্গারু কোর্টে রাজনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীদের বিচার এমন একটা ধোঁকাবাজি যা কেবল মিথ্যাশ্রয়ীই নয়, তা একদিকে বিচার বিভাগকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে এবং অন্যদিকে দুর্নীতি দমনের আইনসিদ্ধ প্রক্রিয়াকে এমনভাবেই ধ্বংস করে দিচ্ছে যে আগামী বহু বছর কার্যকরভাবে দুর্নীতি দমন করা যাবে না; (৪) সংস্কারের নামে খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনাকে রাজনীতি থেকে জোর করে উৎখাত করা অসম্ভব, কারণ তাঁরা সংবিধানসম্মত ভোটের রাজনীতি করেন ও তাঁদের বিপুল জনসমর্থন রয়েছে এবং (৫) সর্বোপরি দেশের সবাই মেনে চলছে_এমন একটি গণতান্ত্রিক সংবিধানকে মিলিটারি পদ আর জরুরি আইনের জোরে লঙ্ঘন করা, এর রাজনৈতিক ও মৌলিক নির্দেশনা না মানা হচ্ছে একে অবমাননা করা, যা জাতীয় স্বার্থেই একেবারে অগ্রহণযোগ্য আর গুরুতর অপরাধ তো বটেই।
এখন যতই দিন যাচ্ছে ততই প্রমাণ হচ্ছে যে ১/১১-এর মইন-ফখরুদ্দীন সরকার সশস্ত্র বাহিনীর গোয়েন্দা সংস্থার একাংশ, তথাকথিত টাস্কফোর্স ও দুর্নীতি দমন কমিশনকে ব্যবহার করে যেসব কাজকর্ম করেছিল তার অনেকগুলোই ছিল অবৈধ ও বেআইনি। অবশ্য ১/১১-এর সরকারের শাসনামলে কিছু পত্র-পত্রিকা ও কয়েকটি টেলিভিশন চ্যানেল আর সমাজে উচ্চশিক্ষিত বলে সমাদৃত কিছু লোক এসব বেআইনি কাজকেই মহা গৌরবময় বলে নির্লজ্জভাবে প্রচার করতেন। এখন এদের অনেকেই ভোল পাল্টাতে ব্যস্ত রয়েছেন।
মইন-ফখরুদ্দীন সরকারের বহুল প্রচারিত কীর্তির মধ্যে অন্তত তিনটি এখন আদালতে অবৈধ বা ভুল বলে প্রমাণিত হয়েছে। এর একটি হলো ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে জোর করে ১২০০ কোটি টাকা আদায় করা। এ টাকা বাংলাদেশ ব্যাংকে গচ্ছিত আছে ঠিকই, কিন্তু দুটি কম্পানির করা মামলায় সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ রায় দিয়েছেন যে তাঁদের কাছ থেকে ১/১১-এর টাস্কফোর্স যে ৩৯৭ কোটি টাকা আদায় করেছিল তা বেআইনি কাজ হয়েছে। ওরকমভাবে টাকা নেওয়ার অধিকার কোনো আইনে সরকারের নেই, তাই ওই টাকা আসল মালিকদের ফেরত দিতে হবে। যে দুটি কম্পানির পক্ষে এ রায় হয়েছে সেগুলো হচ্ছে ক্যাথেলি ডেটেড টি অ্যান্ড ল্যান্ড বাংলাদেশ (২৩৭ কোটি টাকা) এবং এস আলম স্টিল লিমিটেড (৬০ কোটি টাকা)। অবশ্য বর্তমান অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত এখনো বলছেন যে তিনি ওই রায় দুটির বিরুদ্ধে আপিল করার কথা ভাবছেন। এদিকে জরিমানার নাম করে আদায় করা ২৬০ কোটি টাকা ফেরত চেয়ে হাইকোর্টে রিট আবেদন করেছে বসুন্ধরা গ্রুপ ও ইউনিক হোটেল গ্রুপ।
পাঠকদের অনেকের মনে থাকতে পারে, ১/১১-এর সরকারের সময় কখনো কিছুটা রহস্যে আচ্ছাদিত রেখে বলা হতো যে ওই ১২০০ কোটি টাকা বিদেশে পাচার করা অর্থের অংশবিশেষ। আবার কখনো বলা হতো ওগুলো কালো টাকা। পাঠকদের হয়তো এও মনে আছে যে গ্রেপ্তার হওয়া এবং জিজ্ঞাসাবাদের জন্য অপরিচিত স্থানে সাময়িকভাবে বাস করতে বাধ্য হওয়া বিশিষ্ট ব্যবসায়ীদের কেউ কেউ সে সময় গ্রেপ্তার করে রাখা এমন কিছু রাজনীতিবিদ ইঙ্গিতে ও প্রকাশ্যে জানিয়েছেন, অনেকেই ভয়-ভীতি ও দৈহিক নিপীড়নের শিকার হয়েছিলেন সে সময়।
১/১১-এর সরকারের সময় চাঞ্চল্য সৃষ্টিকারী আরেক ঘটনা ছিল, কয়েকজন জাতীয় সংসদ সদস্যের দ্বারা শুল্কমুক্তভাবে আমদানি করা বিলাসবহুল গাড়ি জব্দ করা। জাতীয় সংসদ সদস্যরা নিজের ব্যবহারের জন্য শুল্কমুক্তভাবে একটি করে গাড়ি আমদানি করতে পারেন, কিন্তু তাঁদের কেউ যদি সেই গাড়ি অন্যের কাছে বিক্রি করে দেন তাহলে মালিকানা বদলের সময় গাড়ির জন্য সরকারের প্রাপ্য শুল্ক রাজস্ব বিভাগে জমা দিতে হবে। মইন-ফখরুদ্দীন সরকারের শুরুতেই বিদেশ থেকে সংসদ সদস্যদের আনা, কিন্তু পরে বিক্রি করে দেওয়া গাড়ি বাজেয়াপ্ত করা শুরু হয়। এভাবে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ব্যবহারের জন্য বুলেটপ্রুফ দুটি গাড়িসহ ৪২টি গাড়ি পাকড়াও করা হয় আর আমদানিকারক সংসদ সদস্য ও তাঁদের গাড়ির ক্রেতাদের গ্রেপ্তার করার মারমার কাটকাট অভিযান চলে। অবশ্য তাঁদের অনেকে আত্মগোপন করতে বা বিদেশে চলে যেতে সক্ষম হন। সে সময় এসব গাড়ি বাজেয়াপ্ত করাকে জাতীয় সংসদ সদস্যদের দুর্নীতির সাক্ষ্য হিসেবে প্রচার করা হয়। জেনারেল মইন একসময় বলেন, বাজেয়াপ্ত করা গাড়িগুলো নিলামে বিক্রি করে অর্জিত টাকা দিয়ে গরিব শিশুদের জন্য হাসপাতাল তৈরি করা হবে। বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, আজ পর্যন্ত ওইসব গাড়ির একটিও নিলাম করা যায়নি, বরং ৪২টির মধ্যে ৩২টি গাড়িই মালিকরা ফেরত পেয়েছেন আদালতে প্রমাণ করে যে তাঁরা সরকারের শুল্ক জমা দিয়েছেন বা জমা দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। অথচ ২০০৭ সালের প্রথমার্ধ কেটেছে সংসদ সদস্যদের জন্য ভয়ংকর সময় হিসেবে আর অনির্বাচিত চাপিয়ে দেওয়া সরকারের দুর্নীতি দমনে সাফল্যের প্রচারের আনন্দে। শেষ পর্যন্ত দেখা গেল, সেই প্রচার ঢোলের মতোই ভেতরে একেবারে শূন্য।
মইন-ফখরুদ্দীনের শাসনামলে দুর্নীতির অভিযোগে বেশ কয়েকজন রাজনীতিবিদ ও কিছু ব্যবসায়ীকে বিশেষ আদালতে সাজা দেওয়া হয়েছিল। সাজার মধ্যে ছিল আট থেকে ১৩ বছর পর্যন্ত সশ্রম কারাদণ্ড। সম্প্রতি হাইকোর্টে বহু দণ্ডিত ব্যক্তির সাজা বাতিল হয়ে গেছে আইনি ভুল, সাক্ষীসাবুদ সঠিক না হওয়া ও তদন্তে গাফিলতির জন্য। অর্থাৎ আপিলকারীরা এত দিন অনর্থক অথবা তাঁদের প্রতি তৎকালীন গদিনসীনদের বিদ্বেষের ফলে অত্যাচারিত হয়েছেন। আপিলে যাঁরা খালাস হয়ে গেছেন, তাঁদের মধ্যে আছেন আওয়ামী লীগের মোহাম্মদ নাসিম, ড. মহীউদ্দীন খান আলমগীর ও আরো কয়েকজন। আছেন বিএনপির মীর্জা আব্বাস, মোরশেদ খান, ব্যারিস্টার নাজমুল হুদা, আমানউল্লাহ আমান ও ব্যবসায়ী ফয়সাল মোর্শেদ খান প্রমুখ।
এ উদাহরণগুলো প্রমাণ করে যে ১/১১-এর সরকার ছিল একটা বাজে সরকার। তদুপরি আমি মনে করি, সেটি আসলেও ছিল অবৈধ সরকার। সংবিধানে তো এ রকমভাবে গড়া ও দু-তিন বছর মেয়াদি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কোনো অস্তিত্ব বা স্বীকৃতি নেই। সবার মনে রাখা দরকার, এ রকম উড়ে এসে জুড়ে বসা সরকার দিয়ে দেশের কোনো উপকার হয় না, বরং ক্ষতিই হয়। এরা রাজনীতি ও প্রশাসনকে বিকৃত করে। গণতান্ত্রিক-প্রক্রিয়ার বিকাশকে দারুণভাবে বাধাগ্রস্ত করে। যারা একে সমর্থন করেছিল, এত দিনে তাদের বোধোদয় হয়েছে আশা করি।
লেখক : সাংবাদিক
[সূত্রঃ কালের কণ্ঠ, ০৪/০৯/১০]



























